Header Border

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ (বসন্তকাল) ১৯.৯৬°সে

করোনাকালে আত্মঘাতী ভোট কেন?

সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্ট : সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে করোনাকালেই জাতীয় সংসদের দুটি আসনের স্থগিত থাকা উপনির্বাচন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল শনিবার কমিশনের জরুরি সভায় যশোর-৬ ও বগুড়া-১ আসনে ১৪ জুলাই ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ইসি সচিব মো. আলমগীর।

নির্বাচন বিশ্নেষকরা বলছেন, মানুষের জীবনের তুলনায় আইন বড় হতে পারে না। ভোটারদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান অগ্রহণযোগ্য। তবে ইসি সদস্যরা বলছেন, অন্য কোনো উপায় না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছেন। কমিশন সভায় এ ব্যাপারে সব কমিশনার একমত হয়েছেন। সচিব আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দেশে করোনার সংক্রমণের ‘পিকটাইমে’ ঘরে থাকাসহ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শের সঙ্গে একমত। তারা এ ধরনের নির্বাচন আয়োজন থেকে বিরত থাকতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের অভিমত, নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হবে। নির্বাচন মানেই জনসমাগম। এতে প্রচার-প্রচারণা থাকবে। ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে জনসমাগম হবে। এতে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মানা সম্ভব হবে না। সুতরাং এ অবস্থায় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে। সংক্রমণ পরিস্থিতি নিম্নমুখী অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় যাওয়ার পর তারা এই নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেন।

ইসি সূত্র জানায়, গতকাল বিকেলে নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে ওই সভায় চার নির্বাচন কমিশনার ও জ্যেষ্ঠ সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। গত ১৮ জানুয়ারি সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের মৃত্যুতে বগুড়া-১ এবং ২১ জানুয়ারি ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে যশোর-৬ আসন শূন্য হয়। সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন এবং দৈবদুর্বিপাকের কারণে সম্ভব না হলে আরও ৯০ দিন- সব মিলিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে ভোট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

গত ২৯ মার্চ এই দুটি উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। করোনার কারণে ভোটের সপ্তাহখানেক আগে স্থগিত করা হয় নির্বাচন। একই সঙ্গে আটকে আছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনও। দুই উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধান নির্ধারিত ১৮০ দিন ১৫ জুলাই শেষ হতে যাচ্ছে বলে ইসির যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান জানিয়েছেন।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনাকাল শুরু হওয়ার পরপরই নির্ধারিত সময়ে এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। একপর্যায়ে তফসিল ঘোষণা করেও স্থগিত করতে বাধ্য হন তারা। পরে কমিশন সভায় এ বিষয়ে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করতে না পারলে কী করা যাবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। এ নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দিকনির্দেশনা চাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। এর মধ্যেই গতকাল হঠাৎ করে ইসি জরুরি সভায় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। ইসি সচিব আলমগীর বলেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ১৪ জুলাই ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৮০ দিনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ইসির হাতে নেই।

তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে সিইসি সংশ্নিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সেখান থেকে সিইসিকে জানানো হয়েছে, সংবিধানে উল্লেখিত সময়ের মধ্যে ভোটগ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব বিবেচনায় ইসি ১৪ জুলাই ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইসি সচিব জানান, এ উপনির্বাচনের তফসিল আগেই ঘোষণা করা ছিল। যে অবস্থায় নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল, সে অবস্থা থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হবে। তাই নতুন করে কারও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারের শূন্য অন্যান্য নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওইসব নির্বাচনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এগুলো পরে হবে।

ইসির সঙ্গে একমত নন বিশ্নেষকরা :ইসির এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারছেন না নির্বাচন বিশ্নেষকরা। কাজী রকিব কমিশনের সদস্য সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক এ বিষয়ে বলেন, ‘ফোর্স মেজর’ বলতে আইনে একটা বিষয় রয়েছে। পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত হলে অসীম সময় পর্যন্ত নির্বাচন আটকে থাকতে পারে। কারণ এটা প্রাকৃতিক আইন। এর চেয়ে বড় কিছু নেই।

এজন্য রাষ্ট্রপতি বা আদালতের কাছে ব্যাখ্যা আনতে যাওয়ারও প্রয়োজন মনে করেন না সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার। তার মতে, শুধু কমিশন সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ থাকবে, মহামারিকাল শেষ হয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের এই নির্দেশনা পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। অথবা নির্বাচন স্থগিত রাখা হলো।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আদালতে গিয়ে সংবিধানের ব্যাখ্যা বা মতামত নিয়ে আসা যেতে পারে। কিন্তু সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের কোনো অর্থ নেই। তিনি আরও বলেন, ভোটার উপস্থিতি না হলেও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি তাদের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, মত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের :করোনা সংক্রমণের ‘পিকটাইমে’ এ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে ঘরে থাকাসহ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগও। চলতি জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সংক্রমণের এই উচ্চ হার অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আট সদস্যের জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি। এই সময়ে আরও এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।

আগস্টে সংক্রমণের মাত্রা নিম্নমুখী হতে শুরু করবে। বর্তমানে মৃত্যুহার রয়েছে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তা বেড়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রধান ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সময় সংবাদ লাইভকে বলেন, এই পূর্বাভাসের বাস্তবতা কিংবা কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। অর্থাৎ সরকার জোনভিত্তিক যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে এই পূর্বাভাস হয়তো মিলবে। কিন্তু আগের মতো বিশেষ করে গত ২৬ মার্চ ছুটি ঘোষণার পর এবং ঈদের ছুটিতে মানুষ যেভাবে আসা-যাওয়া করেছে, সে ধরনের পরিস্থিতি হলে এটি কাজে আসবে না। তখন সংক্রমণ ও মৃত্যু- দুটিই আবারও বাড়বে। সুতরাং কার্যকর লকডাউন, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে ঘরে অবস্থান করলেই কেবল আগস্টে গিয়ে সংক্রমণের মাত্রা নিম্নমুখী হতে পারে। কিন্তু এগুলো মেনে না চললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, সামাজিক দূরত্ব এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। এসব না মানলে সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে। সুতরাং নির্বাচন আয়োজন করোনার সংক্রমণ নিঃসন্দেহে বাড়াবে। কারণ নির্বাচনের ক্যাম্পেইন থাকবে। সেখানে জনসমাগম হবে। ভোটের দিনও জনসমাগম হবে। বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতির জন্য এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা কি করোনা প্রতিরোধ করতে চান, নাকি সংক্রমণ আরও বাড়বে সেটি চাইছেন? সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে চাইলে আরও কিছুদিন পর যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তখন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ভাবা যেতে পারে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের নির্বাচন আয়োজন জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি বলেই মনে করি। সুতরাং জেনেশুনে মানুষকে এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। নির্বাচন তো মানুষের জন্যই। সেই মানুষই যদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাহলে নির্বাচন করে লাভ কী? মাসের পর মাস ধরে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তো বন্ধ রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় উচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে নির্বাচন না দিলে তো এমন কোনো ক্ষতি হতো না। সংক্রমণ পরিস্থিতি নিম্নমুখী হওয়ার পর এই নির্বাচনের আয়োজন করা যায়। এসব বিষয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে ভাবতে হবে।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত- ইসি: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন করা ছাড়া ‘কোনো উপায় নেই’ উল্লেখ করেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা কমিশন একমত হয়েছি, ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে এ দুটি উপনির্বাচন করতেই হবে।’

ইসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সভায় কমিশনার মাহবুব তালুকদার ছাড়া অন্য কমিশনাররা অংশ নেন। সভায় বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনে ব্যালটে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত বেসিন রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই দুটি আসন ছাড়াও বর্তমানে পাবনা-৪, ঢাকা-৫ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসন শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে পাবনা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনে দ্বিতীয় ৯০ দিনে ভোটগ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এ তিনটি আসনই শূন্য হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ইসির এক কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারভুক্ত প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইসিকে এখনও কিছু জানানো হয়নি। এ কারণে এ বিষয়ে কমিশন এ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে না।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

টঙ্গীতে মার্কেট ভবনের গুদামে আগুন,ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
রোজা ঘিরে ভোক্তার দুশ্চিন্তা বাড়ছে
ফের বাড়ছে বিদ্যুতের দাম, ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ৭০ পয়সা
বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বৃদ্ধি হবে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’: রিজভী
ওষুধের দামে নাভিশ্বাস
দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

আরও খবর