Header Border

ঢাকা, বুধবার, ২৪শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (বর্ষাকাল) ৩০.৯৬°সে

গ্যাসের তীব্র সংকট ;১০ নম্বর বিপদ সংকেত

সময় সংবাদ লা্ইভ রিপোর্টঃ কয়েক মাস ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। গ্যাসের অভাবে দিনের বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে অনেক শিল্পকারখানা। কোনো কোনো শিল্পকারখানা চলছে জেনারেটরে। নিয়মিত গ্যাস পাচ্ছেন না আবাসিকের অনেক গ্রাহকও। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে আরও দুঃসময় অপেক্ষা করছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাসের (এলএনজি) পরিমাণ আরও কমে যাবে। এতদিন যেখানে গড়ে ৪০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে আসছিল, আগামী দুই মাস সেটি গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসবে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, দাম বেশি হওয়ায় এমনিতেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ। এর মধ্যে চলতি অক্টোরব ও নভেম্বরে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত এলএনজির পরিমাণ কমে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এতদিন কাতার থেকে গড়ে প্রতিমাসে পাঁচটি করে এলএনজির কার্গো আসত। কিন্তু চলতি অক্টোবর ও আগামী নভেম্বরে আসবে চারটি করে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাবে। অর্থাৎ এতদিন যেখানে প্রতিমাসে গড়ে ৪০ কোটি ঘনফুট

এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতো, আগামী দুই মাস সেটি কমে দাঁড়াবে ৩০-৩৫ কোটি ঘনফুটে। কার্গো কমে যাওয়া নিয়ে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা চিন্তায় পড়ে গেছেন। এই সময়ে দেশে গ্যাসের চাহিদা কী করে সামাল দেবেন, সেটি নিয়ে পরিকল্পনা করছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. নাজমুল আহসানের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়। সেখানে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আপাতত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে- সিএনজি স্টেশনগুলোয় আরও দুই ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হবে। কার্গোর সংখ্যা কমে যাওয়ায় অক্টোবর-নভেম্বরে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১০০ এমএমসিএফডি কমে যাবে। আমরা ধারণা করছি, সিএনজি খাতে আরও দুই ঘণ্টা করে রেশনিং করলে ১১০ এমএমফিএফডি গ্যাস সাশ্রয় হবে। সেটি অন্য খাতে সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে।’

জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত ১ মার্চ থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকছে। এখন আরও দুই ঘণ্টা যোগ হলে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে ৭ ঘণ্টা করে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. কামরুজ্জামান বলেন, আরও দুই ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখা যায় কিনা, সেটি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সিএনজি স্টেশন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ‘আমরা পেট্রোবাংলার এমন সিদ্ধান্তের খবরে হতাশ। গ্যাসে সবচেয়ে বেশি রেভিনিউ দেন সিএনজি স্টেশনের মালিকরা। অথচ এই খাত অবহেলিত।’ তিনি বলেন, ‘পেট্রোবাংলা থেকে আমাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। এখন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তারা বৈঠক করতে চায়।’

এদিকে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, পেট্রোবাংলার কাছ থেকে তারা চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। ফলে শিল্পকারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্যাসের সংকটে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ থাকছে। কখনো কখনো গ্যাসের চাপ বাড়লে শিল্পকারখানা চলে, আবার মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখতে হয়।

নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গ্যাসের সংকট অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এ অবস্থা বেশি দিন চললে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করে রাখতে হবে।’

আবাসিকের অনেক গ্রাহকও গ্যাস সংকটে আছেন। রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলোয় আবাসিক গ্রাহকদের প্রায়ই গ্যাস থাকছে না। নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কয়েক জায়গায় আবাসিক গ্রাহকরা গ্যাসের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘বিশ^ব্যাপী জ্বালানি সংকট চলছে। সেই প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এলএনজি আমদানি কমে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগ এলএনজি আমদানির চেষ্টা করছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির চুক্তি করলেও সেটি পেতে আরও দু-এক বছর সময় লাগবে। তবু আমরা গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’

দেশে গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা কত, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। পেট্রোবাংলা এবং তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, শিল্পমালিকরা প্রতিদিন গ্যাসের সংযোগ বা কারখানার গ্যাসের লোড বৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ দৌড়ঝাঁপ করেন, তাতে পাঁচ হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করলেও সেটি ব্যবহার হবে। তবে মোটামুটি চার হাজার এমএমসিএফডি গ্যাস প্রতিদিন সরবরাহ করতে পারলে তা সন্তোষজনক হবে। কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে ২৭০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। অর্থাৎ ১৩০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এখন আরও ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে ঘাটতি আরও বাড়বে।

পেট্রোবাংলার হিসাবে গতকাল সারা দিন পেট্রোবাংলা ২৬৮৬ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে এলএনজি ৩৮০ এমএমসিএফডি। বাকিটা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া।

গ্যাস সংকটের বিষয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম বলেন, ‘ক্যানসার আক্রান্ত হলে যেমন মানুষ ধীরে ধীরে মরে যায়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

মো. হাতেম বলেন, ‘সরকার যদি রির্জাভ থেকে এলএনজি আমদানি করে আমাদের সরবরাহ করত, তবে আমরা আগামী ছয় মাসে তার অনেক বেশি রিজার্ভ রিটার্ন দিতে পারতাম।’

দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাসের এমডি মো. হারুনুর রশিদ মোল্লা বলেন, ‘পেট্রোবাংলা থেকে আমাদের যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়, সেটি আমরা আমাদের গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করি। এলএনজি আমদানি কমে যাওয়ায় বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে সংকট সমাধানের।’

২০১৫ সালের দিকেও দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুট। সেটি কমে এখন ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকার বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করে আসছিল। এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ফলে গ্যাসের সংকট বাড়তে থাকে।

দেশে এলএনজি আমদানি করে রাষ্ট্রায় কোম্পানি ‘রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড’ (আরপিজিসিএল)। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ওমান ও কাতার থেকে প্রতিমাসে পাঁচটি করে এলএনজি কার্গো (জাহাজ) আনা হচ্ছে। এতে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম পড়ছে প্রায় ১৫ মার্কিন ডলার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে এই দাম ছিল ১০ ডলারের কম। আর সিঙ্গাপুরের খোলাবাজার থেকে কেনা এলএনজি নিয়ে প্রতিমাসে তিনটি করে জাহাজ আসার কথা। স্পট মার্কেট থেকে গত বছর প্রতি ইউনিট এলএনজি আমদানি করা হতো ৫ থেকে ৬ ডলারের মধ্যে। এখন বিশ^বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৬০ ডলারের বেশি। গত জুনেও তা ৩৬ ডলারে ছিল।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিবের নেতৃত্বে একটি টিম গত সপ্তাহে কাতার গেছে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর লক্ষ্যে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরও বেশি করে এলএনজি আমদানি করতে চায় সরকার।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

হজে গিয়ে ১০ বাংলাদেশির মৃত্যু
কর ও ভ্যাটের চাপ আরও বাড়বে
ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ ড্রোন হামলা হিজবুল্লাহর
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে সব দেশের প্রতি আহ্বান জাতিসংঘের
মোদি না রাহুল, কে হচ্ছেন ভারতের কান্ডারি?
ঢাকার কাছেই চলে এসেছে সবচেয়ে বিষধর রাসেলস ভাইপার

আরও খবর