Header Border

ঢাকা, বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল) ৩১.৯৬°সে

ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম পেট্রল-সিআইডি’ গল্প অপরাধে প্ররোচিত হচ্ছে শিশু -কিশোর

সময় সংবাদ লাইভ রিপোর্টঃ সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের কয়েকজনের কাছ থেকে পুলিশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। পুলিশ, ঘটনার সাক্ষী, পরিবার, ঘটনার শিকার ব্যক্তি- এরকম বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনা যেভাবে ঘটেছে এসব বিষয় জানতে পেরেছে। স্বীকারোক্তিতে জানা গেছে, ‘ক্রাইম পেট্রলের’ গল্প দেখতে পেরেছে খুব সাধারণ একটা মানুষ খুনের পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বেশকটি ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে, অপরাধবিষয়ক তথ্যচিত্র শিশুদের মনে প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে কিশোরদের ওপর। কিশোর বয়সে ভালোমন্দের বিবেচনাবোধ না থাকায় মঞ্চস্থ ঘটনাগুলোকে উত্তেজনাকর মনে করে।

ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রল’ কী শেখাচ্ছে? আকাশ সংস্কৃতির কারণে সারাদেশে এ ধরনের টিভি সিরিয়াল বা অনুষ্ঠান দেখে মূলত অপরাধমূলক কর্মকান্ডে প্ররোচিত হচ্ছে কিশোর-তরুণরা। ‘ক্রাইম  পেট্রল’ বা ‘সিআইডি’ নামক অনুষ্ঠানের কল্প কাহিনী থেকে অন্যায়-অপকর্মের কৌশল রপ্ত করছে মানুষ। কিশোর গ্যাং তৈরী, অপরাধ করার কৌশল, খুন-খারাবি ছাড়াও গৃহ বিবাদ সৃষ্টি করছে। এসব সিরিয়াল দেখে ঘরে-ঘরে বিরোধ, পরকীয়া চর্চা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ-কলোহ সৃষ্টি, বৌ-শাশুড়ি মধ্যে বিবাদ বাধানোসহ ঘরে ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করছে। ভেঙে যাচ্ছে সুখের সংসার। ভারতীয় এসব সিরিয়াল সেদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মাঝে একধরণের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে। কোনো কোনো ঘরে সিরিয়ালগুলো নিয়মিত দেখার নেশায় পরিণত হয়েছে। এমনকি এসব সিরিয়ালের অনুকরণে এখন দেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেলেও অনুষ্ঠান  তৈরি করছে। ফলে সমাজে অবক্ষয় বাড়ছে। এধরণের অনুষ্ঠান থেকে প্রকৃতপক্ষে ভালো কিছু শেখার নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় একই পরিবারের চার জনকে গলা কেটে হত্যার লোমহর্ষক ঘটনার মূল আসামি রাহানুরকে গ্রেফতার করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃত আসামি রাহানুর সিআইডির কাছে স্বীকার করেছেন, ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে তার নিজের ভাই, ভাবিসহ পুরো পরিবারকে হত্যা করতে প্ররোচিত হয়। এরআগেও দেশে কয়েকটি হত্যাকান্ড ঘটেছে ‘ক্রাইম পেট্রল’ অনুকরণ করে। বিভিন্ন সময়ে ‘ক্রাইম পেট্রল’ বা ভারতীয় সিরিয়াল দেখে প্ররোরিচত হয়ে অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও হত্যাকান্ডসহ অপরাধমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এর আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন স্বীকার করেছে তারা ক্রাইম পেট্রল দেখে অপরাধ করা এবং পালানোর কৌশল রপ্ত করেছে।
 গত ২৪ নবেম্বর সিআইডি সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক জানান, রাহানুর নামে গ্রেফতার এক আসামি ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে তার নিজের ভাই, ভাবিসহ পুরো পরিবারকে (চার জন) হত্যা করতে  প্ররোচিত হয়। স্বীকারোক্তিতে এমনটাই জানিয়েছে খুনি রাহানুর। কোমল পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরে ঘুমন্ত অবস্থায় চাপাতি দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন- রাহানুরের ভাই শাহিনুর রহমান, শাহিনুরের স্ত্রী সাবিনা, মেয়ে তাছনিম ও ছেলে সিয়াম।  গত ১৫ অক্টোবর রাতে একই পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। ঘাতক রাহানুর নিয়মিত ফেনসিডিল সেবনের কথাও সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, গ্রেফতার রাহানুল দীর্ঘদিন ফেনসিডিলের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ সেবন করতো। একসময় ফেনসিডিলসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং কারাগারেও ছিলো সে। এরপর স্ত্রী ফাহিমার সঙ্গে তার ডির্ভোস হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রায়হানুল বেকার অবস্থায় ভাই ও ভাবির সংসারে থাকতে শুরু করে। ভাবি সাবিনা খাতুন মাঝেমধ্যে টাকার জন্য তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করত। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের বিচ্ছেদ ও বেকার জীবনে ভাবির দুর্ব্যবহারের কারণে একসময় ভাই-ভাবিসহ পুরো পরিবারকে হত্যার পরিকল্পনা করে রাহানুর। ‘হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থানীয় আবু জাফরের দোকান থেকে দুটি স্পিড (কোমল পানীয়) কিনে তার মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় রাহানুর। ঘুমের ওষুধ মেশানো এ পানীয় সে তার ভাই, ভাবি, ভাতিজি ও ভাতিজাকে খেতে দেয়। তারা ঘুমিয়ে পড়লে রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে চাপাতি দিয়ে প্রথমে সে ভাই এবং পরবর্তীতে ভাবিসহ বাকিদের হত্যা করে। আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী উদ্ধার করা হয় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিসহ রক্তমাখা কাপড়’, বলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলায় ভারতীয় সিরিয়াল ‘ক্রাইম পেট্রল’ দেখে মোহাম্মদ আরাফাত (১২) নামের এক শিশুকে হত্যাচেষ্টা চালায় তার কয়েক সহপাঠী। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে একটি আখক্ষেতে নিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, আখক্ষেতে প্রায় ১৩ ঘণ্টা ধরে পড়ে থাকার পরও সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়। ঈশ্বরদী থানা পুলিশ জানায়,  আরাফাতের এক জোড়া রোলার স্কেটস ছিল। রোলার স্কেটসটি সে বিক্রি করতে চাইলে তার বন্ধু রাফি কিনতে চায়। আরাফাত রোলার স্কেটসটি ২ হাজার ৫শ টাকায় রাফির কাছে বিক্রি করে। কিন্তু পুরো টাকাটা বাকি থাকায় আরাফাত টাকার জন্য রাফিকে চাপ দিতে থাকে। এদিকে, রাফির কবুতর ছিল। সে টাকা দিতে না পারায় আরাফাত তার কাছে কবুতর চায়। কিন্তু, রাফি কবুতর দিতেও অস্বীকৃতি জানায়। উল্টো রাফি দুই বন্ধু প্রিন্স এবং রামিমকে সঙ্গে নিয়ে ভারতীয় টিভি সিরিজ ‘ক্রাইম পেট্রল’ কাহিনীর মতো করে আরাফাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আখ খাওয়ার কথা বলে তারা আরাফাতকে আখক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে লোহার রড দিয়ে আরাফাতের মাথায় আঘাত করে। উপর্যুপরি আঘাতে তার মাথার মগজ বেরিয়ে যায় এবং কান কেটে যায়। পরে, ঘটনায় ব্যবহৃত রডটি একটি পুকুরে ফেলে দেয় তারা।
২০১৯ সালের ১ জুন পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার পাড়েরহাট ইউনিয়নের উমেদপুর গ্রামে অপহরণের পর পাড়েরহাট রাজলক্ষী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সালাহউদ্দিনকে (১৩) হত্যা করা হয়। রাতে শব-ই-কদর এর নামাজ পড়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় সালাহউদ্দিন। এরপর সে আর ঘরে ফিরে আসেনি। পরের দিন সকালে একটি মোবাইল থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে ফোন দেয় অপহরণকারীরা। পরবর্তীতে পরিবারের লোকজন বিষয়টি পুলিশকে জানালে পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে মূল পরিকল্পনাকারী সোহানসহ ৯ জনকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় তার বাবা সিদ্দিকুর রহমান বাদী হয়ে ইন্দুরকানি থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৪ থেকে ৫ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন, ভারতীয় অপরাধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ক্রাইম পেট্রল দেখেই শিশু সালাহউদ্দিনকে অপহরণের পর হত্যা এবং পরিবারের কাছে চাঁদা দাবির ব্যাপারে আগ্রহী হয় অপহরণকারীরা। এর আগে কৌশলে সালাহউদ্দিনকে ডেকে নিয়ে কোমল পানীয়র সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে তারা। এরপর গলায় মাছ ধরা জালের রশি পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
২০১৮ সালের ৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় স্কুলছাত্র সাদমান ইকবাল রাকিনকে (১০) আসরের নামাজ পড়তে বাড়ির পাশের মসজিদে। তারপর থেকেই সে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের ঘণ্টাখানেক পর অজ্ঞাত ব্যক্তিরা রাকিনের বাবাকে ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এরপরেই ওই ফোন নম্বরটি বন্ধ করে রাখা হয়। অপহরণকারীরা যে সিমটি ব্যবহার করে মুক্তিপণের জন্য ফোন করেছিল, রাকিনের মা ওই সিমটি মোবাইলসহ ৬ মাস আগে হারিয়ে ফেলেছিলেন। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের সন্ধান না পেয়ে পরদিন রাকিনের বাবা শ্রীপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। নিখোঁজের ছয়দিন পর ১১ ডিসেম্বর স্থানীয়রা পঁচা দুর্গন্ধের সূত্র ধরে বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়ের ভেতর যান। সেখানেই তারা রাকিনের অর্ধগলিত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে ওইদিন দুপুরে নিহত রাকিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুজনের একজন হলেন-নিহত রাকিনের প্রাইভেট শিক্ষক একই এলাকার পারভেজ শিকদার (১৮)। অন্যজনের বয়স ১৬ বছর। এ ঘটনায় র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া পারভেজ ২০১৭ সালে স্থানীয় ফাউগান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে শিমুলতলী কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এগ্রিকালচার ডিপ্লোমায় ভর্তি হন। পারভেজের সহযোগী ফাউগান উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। তিনি ওই ছাত্রকে প্রাইভেট পড়াতেন। এর আগে পারভেজ বিভিন্ন সময়ে ছোটখাটো অপরাধমূলক কাজ করেছেন বলে র‌্যাবের কাছে স্বীকার করেন। সে আরও স্বীকার করে, বিভিন্ন অপরাধ বিষয়ক সিনেমা, নাটক, বিশেষ করে ‘ক্রাইম পেট্রল’ দেখে তিনি এই কাজ করতে উৎসাহিত হয়ে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে জানান একজন র‌্যাব কর্মকর্তা।
প্রথমে গলা টিপে হত্যা করেন ৯ মাসের শিশু আভিয়া খাতুনকে। পরে একটি মুরগির খামারের ডোবায় লাশ লুকিয়ে রাখেন সাদিয়া। টিভিতে ক্রাইম পেট্রল দেখে এসব শিখেছেন বলে আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন তিনি। রাতেই তাকে পাবনা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের ১১ মে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বাবুলচরা গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত শিশু আভিয়া খাতুন ওই গ্রামের আনসারুল-মিলি দম্পতির মেয়ে। আসামি সাদিয়া একই গ্রামের সোহানের স্ত্রী। ঈশ্বরদী থানার ওসি সময় সংবাদ লাইভকে জানান, জবানবন্দিতে হত্যার দায় স্বীকার করে সাদিয়া বলেছেন- টিভিতে ক্রাইম পেট্রল দেখেই হত্যার পদ্ধতি শিখেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’, আঘাত হানতে পারে ২৬ মে
দুবাইয়ে গোপন সম্পদের পাহাড়, তালিকায় ৩৯৪ বাংলাদেশি
সড়কে মৃত্যুর মিছিল:দশ বছরে প্রাণহানি ৭৮ হাজার,দায় নিচ্ছে না কেউ
প্রথম ধাপে উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন যারা
চট্টগ্রামে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত
বেপরোয়া মন্ত্রী-এমপিরা ইসির নজরদারিতে

আরও খবর