Header Border

ঢাকা, রবিবার, ১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল) ৩০.৯৬°সে

সরকারের লকডাউন নিদের্শনা মানতে জনগণের অনীহা

আলমগীর পারভেজ :ভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে লকডাউনের প্রস্তুতি না থাকায় সরকারের নিদের্শনা মানতে জনগণের অনীহা।নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় গরিব মানুষের কথা ভাবা হয়নি। বিবেচনায় নেওয়া হয়নি “ক্ষুধা  করোনার চেয়েও ভয়ঙ্কর”। খাদ্যের জোগান দিতে না পারলে গরিব মানুষকে যে ঘরে রাখা যাবে না, তা ভাবা হয়নি। ঘোষণায় সামগ্রিক পরিকল্পনার ছাপ দৃশ্যমান হয়নি। এবারের এই নিষেধাজ্ঞা বা লকডাউন আরও আগে প্রত্যাশিত ছিল। লোক সমাগম ঘটিয়ে উৎসবের সঙ্গে বহুকিছু উদযাপন করা হয়েছে।কিন্তু লকডাউন আরোপ করা হলে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনে স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন খাদ্য জোগাড়ের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তা নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ না থাকায় লকডাউনে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান করা হলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলাতে মানুষ নিষেধাজ্ঞা মানছেন না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং অঞ্চলে বিভিন্ন মাত্রার ‘লকডাউন’ আরোপ করা হলেও আমাদের দেশে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত রয়েছেন। সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় লকডাউন শব্দটি ব্যবহার না করে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পাবলিক পরিবহন, শপিংমল বন্ধের ঘোষণা আসলেও চলছে বইমেলা ও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস। একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউনের মতো ব্যবস্থা বাংলাদেশের কার্যকর হয় না, এটা বাস্তবতা। ইতালি, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে লকডাউন কার্যকর করতে পেরেছে। কারণ, তাদের হাতে সেই কৌশল ও প্রযুক্তি আছে। দেশে লকডাউনের মতো সবকিছু বন্ধ করে দিলে ‘দিন আনে দিন খায়’ মানুষের জীবিকার ওপর চাপ পড়ে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ লকডাউনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। এমতাবস্থায় কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতির অনিশ্চিত গতি আরও সংকটে পড়বে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও এলাকায় – বিশেষ করে যেসব জায়গায় করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে লকডাউন আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। ওই সব জায়গায় অঞ্চলভেদে স্বল্প পরিসরে খাবারের দোকান এবং ওষুধের দোকান বাদে অন্য সব দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। তবে কিছু কিছু দেশে লকডাউনের নিয়মকানুন মানা হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে মানুষের বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে অর্থদণ্ড এবং কারাদণ্ডের মত জরিমানার শাস্তিও আরোপ করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে মানুষ যেন ঘর থেকে বের না হতে পারে তা নিশ্চিত করতে দিনের বড় একটা সময় কারফিউ জারি করা হয়। অনেক এলাকাতেই এই কারফিউর সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাবার এবং ওষুধ পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার জানান, বাংলাদেশে এ ধরণের লকডাউন আরোপ করা হলে জনগণের কাছে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হলেও আইনগতভাবে তাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু এরকম ক্ষেত্রে সরকার তার নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করার জন্য পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন। গণপরিবহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় এ রকম সময়ে দরিদ্রদের কাছে খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি পণ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়োগ করা হয়। শুধু গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাতেই নয়, যেসব রাষ্ট্রে রাজতন্ত্র বিদ্যমান সেসব রাষ্ট্রেও সরকার তার নৈতিক দায়িত্ব থেকেই এ ধরণের বিশেষ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের কাছে খাবার ও জরুরি সেবা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে থাকে।
ব্রিটেনের নতুন স্ট্রেইন বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।পুনরায় সংক্রমণ বাড়তে পারে তা বোঝা গিয়েছিল গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে মনে হয়েছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের জন্যে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছে। মুরগি ডিমে তা দিয়ে যেভাবে বাচ্চা ফুটায়, সেভাবে করোনাভাইরাসকেও তা দিয়ে বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে সংক্রমণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সরকার ঘোষিত ১৮ দফা নির্দেশনা সরকারই প্রথম ভঙ্গ করেছে। শুধু তাই নয়, লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে শিক্ষা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনমানুষের সঙ্গে রসিকতাও করেছে। তারা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত ২৯ মার্চের তথ্য দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেছিলেন, আমরা প্রতি সপ্তাহে বিশ্লেষণ করি যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কোনগুলো। ১৩ মার্চ বিশ্লেষণ করে ছয়টি জেলা পেয়েছিলাম। ২০ মার্চ বিশ্লেষণ করে ২০ টি জেলা পেয়েছিলাম। ২৪ মার্চ দেখেছি ২৯টি জেলা ঝুঁকিপূর্ণ। তারমানে সংক্রমণ আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বক্তব্য প্রমাণ করছে এবারের সংক্রমণ ‘হঠাৎ করে’ বেড়ে যায়নি। পুরো মার্চ মাস ধরেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য ছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে। কিন্তু তারা সেই তথ্য প্রকাশ না করে গোপন রেখেছে। তথ্য গোপন রাখার উপকারিতা কী? কোনো উপকারিতা নেই, ক্ষতি আছে। ১৩ মার্চে ছয় জেলার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার তথ্য প্রকাশ করে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা দরকার ছিল। ছয় জেলার লোকজনদের দেশের অন্যত্র যাওয়া-আসায় নিরুৎসাহিত করার সুযোগ ছিল। অন্য জেলার লোকজনদের ঝুঁকিপূর্ণ ছয় জেলায় প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপ করা যেত। তাহলে হয়ত ২০ জেলা থেকে ২৯ জেলায় সংক্রমণ এভাবে ছড়িয়ে পড়ত না। কিন্তু তথ্য গোপন রেখে, কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে এখন বলা হচ্ছে সংক্রমণ ‘হঠাৎ করে’ বেড়ে গেছে।
চলছে ৭ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ৩ এপ্রিল ঘোষণা দিয়েছিলেন লকডাউনের। ৪ এপ্রিল সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় লকডাউন শব্দটি ব্যবহার না করে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গণপরিবহন, সড়ক, নৌ, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের নিজ পরিবহনে আনা-নেওয়ার কথা। রাতে বের না হওয়া, শপিংমল বন্ধ রেখে অনলাইন বেচা-কেনা চালু, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা জায়গায় কাঁচা বাজার, পোশাক শ্রমিকদের জন্যে কারখানার আশেপাশে ফিল্ড হাসপাতাল তৈরির কথাও বলা হয়েছে। পোশাক কর্মীরা কারখানায় যাবেন কীভাবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। নিষেধাজ্ঞার এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যে জানা গেল বইমেলা চলবে। একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞায় অনেককিছু বন্ধ বা সীমিত পরিসরে চালু থাকলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নিম্ন আয়ের মানুষ। দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ, বস্তিবাসী। তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা, খাদ্যের যোগান দেওয়া বিষয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি সরকারি ঘোষণায়।

এমতাবস্থায় শ্রমশক্তির যে ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, তারা আবারও দুরবস্থার মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন। গত বছর দীর্ঘ সাধারণ ছুটির সময় দুবেলা দুমুঠো খাবারের সন্ধানে ঢাকা মহানগরে খেটে খাওয়া মানুষের কান্নাকাটি, ছোটাছুটি শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবারও বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ এবার বিধিনিষেধ আরোপের সময় গত বছরের শিক্ষা তেমন একটা কাজে লাগানো হয়নি বলে অনেকেই মনে করেন।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মানুষের চলাচল সীমিত করার বিকল্প নেই। কিন্তু শহরের দোকান ও হোটেলের কর্মচারী, মিস্ত্রি, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ভ্রাম্যমাণ সবজি ও ফল বিক্রেতা এই শ্রেণির মানুষ ঘর থেকে না বেরোলে খাবেন কী? এ ছাড়া অর্থনৈতিক তৎপরতা স্তিমিত হলে সামগ্রিক চাহিদাও কমে। বিধিনিষেধ ওঠার পরও তার প্রভাব থেকে যায়, গত বছরের অভিজ্ঞতায় তাই বলছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, লকডাউনের মতো ব্যবস্থা বাংলাদেশের কার্যকর হয় না, এটা বাস্তবতা। ইতালি, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে লকডাউন কার্যকর করতে পেরেছে। কারণ, তাদের হাতে সেই কৌশল ও প্রযুক্তি আছে। এ দেশে লকডাউনের মতো সবকিছু বন্ধ করে দিলে ‘দিন আনে দিন খায়’ মানুষের জীবিকার ওপর চাপ আসে। এমন অবস্থায় মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, টিকা প্রদান এসব বিষয়কেই মূল কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে নিতে হবে। টিকা প্রদান কার্যক্রমকে ভাইরাসের গতির আগে নিয়ে যেতে হবে। তা না পারলে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে।
লকডাউন দিলে আমও যাবে, ছালাও যাবে। কারণ, লকডাউন বাস্তবায়ন করা যাবে না। লকডাউন দেওয়া হলো, কিন্তু সংক্রমণের সুযোগ থাকল। তাহলে শুধু ঘরে বসে থাকা। এতে অর্থনীতির ক্ষতিটাই হয়ে যাবে। তাই এবারের সংক্রমণের এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির গতি অনিশ্চিত। আমরা শুধু বলতে পারি, কী করতে হবে। কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করলে দিনমজুর, সেলুনকর্মী, পরিবহনকর্মী, রেস্তোরাঁকর্মী এমন শ্রেণি প্রথম ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, মানুষ এসব খাতের সেবা নিতে আসবে না। পরের ধাপে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে। এমনিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে। আগামী তিন–চার মাসে রপ্তানি আগের মতো অবস্থায় যাবে না। এ ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীরা আবার বিপদের মধ্যে পড়ে যাবেন। পোশাক রপ্তানিতে আরেক ধরনের সমস্যা আছে। উন্নত দেশগুলো টিকা দেওয়ার কাজটি সেরে ফেলছে। ফলে তাদের অর্থনীতির গতি ফিরে আসছে। অদূর ভবিষ্যতে পোশাকের চাহিদাও বাড়বে। কিন্তু আমাদের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সে চাহিদা পূরণ হবে কি না, সন্দেহ আছে।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ
যেভাবে হজ পালন করবেন
দুবাইয়ে গোপন সম্পদের পাহাড়, তালিকায় ৩৯৪ বাংলাদেশি
সড়কে মৃত্যুর মিছিল:দশ বছরে প্রাণহানি ৭৮ হাজার,দায় নিচ্ছে না কেউ
প্রথম ধাপে উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন যারা
চট্টগ্রামে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত

আরও খবর