Header Border

ঢাকা, শনিবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ (গ্রীষ্মকাল) ৩৫.৯৬°সে

আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস

আলমগীর পারভেজ: আজ ২৩ জুন পলাশী দিবস। বাংলার ইতিহাসের এক কালো দিন। ১৭৫৭ সালের এই দিনে দেশীয় বণিক, বিশ্বাসঘাতক ও ইংরেজ বেনিয়াদের চক্রান্তে পলাশীর প্রান্তরে ২০০ বছরের জন্য বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়। এক ঘণ্টার প্রহসনের যুদ্ধে পরাজয় ঘটে বাংলা, বিহার ও উড়িশ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার। পলাশীর ২৩ জুনের ইতিহাস প্রকৃত সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করার ইতিহাস। ২৩ জুনের ইতিহাস, বিশ্বাস ঘাতকতার ইতিহাস।
১৭৫৭ সালের ১২ জুন কলকাতার ইংরেজ সৈন্যরা চন্দননগরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। সেখানে দুর্গ রক্ষার জন্য অল্প কিছু সৈন্য রেখে তারা ১৩ জুন অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করে। কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের পথে হুগলি, কাটোয়ার দুর্গ, অগ্রদ্বীপ ও পলাশীতে নবাবের সৈন্য থাকা সত্ত্বেও তারা কেউ ইংরেজদের পথ রোধ করল না। নবাব বুঝতে পেরেছিলেন, সেনাপতিরাও এই ষড়যন্ত্রে শামিল। কিন্তু ততক্ষণে আর করার কিছু ছিল না।
নানা আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িশ্যার সিংহাসনে আসীন হন। তখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর। তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রাজসিংহাসনের জন্য লালায়িত ছিলেন সিরাজের নানা আলীবর্দী খাঁর বিশ্বস্ত অনুচর মীর জাফর ও খালা ঘষেটি বেগম। ইংরেজদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ করে নবাবের বিরুদ্ধে নীলনকশা পাকাপোক্ত করে। দিন যতই গড়াচ্ছিল, এ ভূখণ্ডের আকাশে ততই কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল। ১৭৫৭ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতা পরিষদ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। এ প্রস্তাব কার্যকর করতে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ রাজদরবারের অভিজাত সদস্য উমি চাঁদকে এজেন্ট নিযুক্ত করেন। এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়ক মীর জাফর, তা আঁচ করতে পেরে নবাব তাঁকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করে আবদুল হাদীকে অভিষিক্ত করেন। কূটচালে পারদর্শী মীর জাফর পবিত্র কোরআন শরিফ ছুঁয়ে শপথ করায় নবাবের মন গলে যায় এবং মীর জাফরকে প্রধান সেনাপতি পদে পুনর্বহাল করেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিকেরা বলেন, এই ভুল সিদ্ধান্তই নবাব সিরাজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
২৩ জুন সকালেই পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজরা মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। ইংরেজরা ‘লক্ষবাগ’ নামক আমবাগানে সৈন্য সমাবেশ করাল। সকাল আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তার প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তার সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন, সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাদের সামান্য সহায়তা পেলেও মীর মদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবু সাহসী মীর মদন ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু গোলার আঘাতে মীর মদন মৃত্যুবরণ করেন।
মীর জাফর আবারও বিশ্বাসঘাতকতা করে তার সৈন্যবাহিনীকে শিবিরে ফেরার নির্দেশ দেন। এই সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা নবাবকে আক্রমণ করে। যুদ্ধ বিকেলে শেষ হয় এবং নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপিয়ান এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যও কেউ তাকে সাহায্য করেনি।
১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজউদ্দৌলাকে মহানন্দা নদীর পাড় থেকে বন্দী করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দী হওয়ার সময় নবাবের সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী লুৎফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা। এর পরের দিন ৪ জুলাই (মতান্তরে ৩ জুলাই) মীর জাফরের আদেশে তার পুত্র মিরনের তত্ত্বাবধানে আরেক বিশ্বাসঘাতক মোহাম্মদী বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। মুর্শিদাবাদের খোশবাগে নবাব আলীবর্দী খানের কবরের কাছে তাকে কবর দেওয়া হয়।
সিরাজের নানা আলীবর্দী খান মৃত্যুবরণ করেন ১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল। আর পলাশী যুদ্ধে সিরাজের পতন ঘটে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, অর্থাৎ ১৪ মাস ১৪ দিন পর। সিংহাসনে বসার পর থেকে সিরাজকে প্রতিনিয়ত চারদিকের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়েছে। পলাশী যুদ্ধ সম্পর্কে রবার্ট ক্লাইভ তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ‘সেদিন স্থানীয় অধিবাসীরা ইংরেজদের প্রতিরোধ করতে চাইলেই লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল মেরেই তাদের খতম করে দিতে পারত। কিন্তু এ দেশবাসী তা উপলব্ধি করতে পারেনি।
ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, ইংরেজদের পূর্ণিয়ার শওকত জঙ্গকে সাহায্য করা, মীরজাফরের সিংহাসন লাভের বাসনা ও ইংরেজদের পুতুল নবাব বানানোর পরিকল্পনা, ঘষেটি বেগমের সাথে ইংরেজদের যোগাযোগ, ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ সংস্কার, কৃষ্ণ বল্লভকে কোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় দেয়া ইত্যাদির জন্যই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে সকাল সাড়ে ১০টায় ইংরেজ ও নবাবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মীর মদন ও মোহন লালের বীরত্ব সত্ত্বেও জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ, উর্মিচাঁদ, ইয়ার লতিফ প্রমুখ কুচক্রী প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারীদের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের পরাজয় ঘটে।
সেদিন বাংলার মানুষ এগিয়ে যায়নি। তাদের রাজনৈতিক সচেতনতার তখন খুবই অভাব ছিল। পলাশীর ট্র্যাজেডির পরেও বাংলার সাধারণ মানুষ, কৃষক সমাজ দৈনন্দিন জীবন, নিত্যদিনের মতোই মাঠে কৃষিকাজ করেছে। ফসল বুনেছে। অথচ পলাশীর যুদ্ধে গোটা জাতীয় জীবনে কী নিদারুণ ভাগ্য বিপর্যয় ঘটল, কয়েক ঘণ্টার প্রহসন যুদ্ধে গোটা জাতির স্বাধীনতা হরণ করে নিয়ে গেল গোটা কয়েক বেনিয়া ইংরেজ অথচ তাদের টনক নড়ল না। টনক যখন নড়ল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাদের আর তখন কিছুই করার ছিল না। সিরাজউদ্দৌলা কখনো তার দেশের প্রজাদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি। কখনো স্বেচ্ছায় স্বদেশকে বিকিয়ে দেননি। পলাশীর প্রান্তরে মর্মান্তিক নাট্যমঞ্চে একমাত্র তিনি ছিলেন মূল নায়ক। সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, বাংলার স্বাধীনতার শেষ প্রতীক।
ইতিহাস থেকে দেখা যায়, নবাব সিরাজের সঙ্গে, দেশের সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ইতিহাস তাঁদের কাউকেই ক্ষমা করেনি, চক্রান্তকারীদের ভোগ করতে হয়েছে মর্মান্তিক পরিণতি। তাদের করুণ পতন ঘটেছে।
বাংলার ইতিহাসে এই পলাশী অধ্যায় যেমন ন্যক্কারজনক হৃদয়বিদারক ঘটনা, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনে এর মাশুল দিতে হয়েছে দীর্ঘ ২০০ বছরের গোলামির জিঞ্জির। ২৩ জুনের পলাশীর ইতিহাস, কিছু বিশ্বাসঘাতক চক্রান্তকারীর যোগসাজশে দেশের স্বাধীনতা বিদেশি বেনিয়াদের হাতে তুলে দেওয়ার ইতিহাস।
প্রতিবছরের ২৩ জুন আমাদের এই সতর্কবাণী শুনিয়ে যায়, দেশের ভেতরের শত্রুরা বাইরের শত্রুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর। আমরা কি ২৩ জুনের কালো অধ্যায় থেকে আদৌ কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছি? ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো এই যে ‘ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না’।

আপনার মতামত লিখুন :

আরও পড়ুন

বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার
উপজেলায় এমপি মন্ত্রীর সন্তান-স্বজনরা প্রার্থী হলে ব্যবস্থা
সব বিরোধী দলের উপজেলা নির্বাচন বর্জন
৯৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ আবেদন শুরু, যেভাবে করবেন আবেদন
৯৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগ আবেদন শুরু, যেভাবে করবেন আবেদন
মুজিবনগর দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

আরও খবর